February 21, 2026, 8:42 am

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
অমর একুশে: রক্তলেখা ভাষার মহাকাব্য, জাতিসত্তার অগ্নিজাগরণ কুষ্টিয়ায় ইফতার বাজারে বাহারি আয়োজন, জমজমাট শহরজুড়ে বিকিকিনি রোজার মধ্যেই‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ শুরু: ধারাবাহিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে নতুন গতি তিন ধাপে ১২ সংস্কার: শিক্ষাকে “ব্যয়” নয়, “রাষ্ট্রের প্রথম বিনিয়োগ” হিসেবে ঘোষণা, কি করতে যাচ্ছে সরকার মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন: এইচআরসিপি/পাকিস্তানের পাঞ্জাবে ৮ মাসে পুলিশের ৯২৪ জনকে নির্বিচার হত্যা ক্ষমতার শিখরে গিয়ে একের পর এক চমক দেখাচ্ছেন তারেক রহমান রমজানে অফিস-আদালতে কার্যক্রম নতুন সময়সূচিতে প্রথম বৈঠক/মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার নির্দেশনা মন্ত্রিসভা/মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন যারা ২টি শপথই নিলেন জামায়াত জোটের এমপিরা

অমর একুশে: রক্তলেখা ভাষার মহাকাব্য, জাতিসত্তার অগ্নিজাগরণ

ড. আমানুর আমান, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক কুষ্টিয়া, দি কুষ্টিয়া টাইমস/
আজ অমর একুশে। বাঙালির হৃদয়ের গভীরে গাঁথা এক দিন—যেখানে শোক আছে, আছে গর্ব; আছে রক্তের দাগ, আছে আত্মমর্যাদার দীপ্ত ইতিহাস। একুশ কেবল কোনো সাধারণ দিন বা তারিখ নয়; এটি ইতিহাসের বুকে রক্তে লেখা এক মহাকাব্য, বাঙালির আত্মপরিচয়ের ঘোষণা, মাতৃভাষার জন্য অকুতোভয় সংগ্রামের প্রতীক, জাতিসত্তা অর্জনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
ভাষা থেকে জাতিসত্তা/
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর সদ্যগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী এমন এক ঔদ্ধত্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়, যা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা। বাংলা ভাষাভাষী মানুষ ছিল রাষ্ট্রের জনসংখ্যার বড় অংশ, তবুও উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা ছিল রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েমের এক নগ্ন প্রচেষ্টা। এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না—এ ছিল বাঙালির ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করার এক চরম ধৃষ্টতা। শাসকগোষ্ঠীর এই সংকীর্ণ ও বৈষম্যমূলক মনোভাব পূর্ব বাংলার মানুষের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সেই দমনমূলক নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকেই গড়ে ওঠে ভাষা আন্দোলন, যার রক্তাক্ত চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি।
সেদিন ঢাকার রাজপথে শিক্ষার্থীরা ১৪৪ ধারা ভেঙে মাতৃভাষার দাবিতে মিছিল বের করে। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ আরও অনেকে। তাদের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ; আর সেই রক্তই বাঙালির আত্মপরিচয়ের ভিত্তিকে দৃঢ় করে তোলে। ভাষা রক্ষার এ সংগ্রাম কেবল সাংস্কৃতিক দাবি ছিল না—এ ছিল রাজনৈতিক অধিকার, আত্মমর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসনের বীজ রোপণের মুহূর্ত।
ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া/
ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির রাজনৈতিক আত্মজাগরণের প্রথম সুসংগঠিত বিস্ফোরণ। ১৯৫২-র রক্তস্নাত অভিজ্ঞতা জাতিকে শিখিয়ে দেয়—অধিকার আদায় করতে হলে প্রতিবাদে, ঐক্যে ও আত্মত্যাগে অটল থাকতে হয়। সেই চেতনার ধারাবাহিকতাতেই গড়ে ওঠে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের দুর্বার তরঙ্গ, ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে বাঙালির গণরায়ের সুস্পষ্ট উচ্চারণ, এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য সর্বাত্মক সশস্ত্র সংগ্রাম।
একুশে তাই কেবল ভাষার দাবিতে সীমাবদ্ধ কোনো অধ্যায় নয়; এটি স্বাধীনতার বীজ রোপণের মুহূর্ত। ভাষার প্রশ্নে যে জাতি রক্ত দিতে পারে, সে জাতি স্বাধীনতার প্রশ্নেও আপস করে না—এই সত্যই ইতিহাস প্রমাণ করেছে। একুশের চেতনা বাঙালির মধ্যে জাগিয়ে তোলে অসাম্প্রদায়িকতার বোধ, গণতান্ত্রিক অধিকারচেতনা, মানবিক মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার অদম্য স্বপ্ন।
এই কারণেই অমর একুশে কেবল অতীতের স্মারক নয়; এটি জাতির রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও আত্মমর্যাদার এক স্থায়ী ভিত্তিস্তম্ভ।
বিশ্বমঞ্চে একুশে
এক সময় যে একুশে ছিল ঢাকার রাজপথে রক্তাক্ত এক প্রতিবাদের নাম, আজ তা বিশ্বমানবতার সম্পদ। ১৯৯৯ সালে UNESCO ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে—এ যেন বাঙালির আত্মত্যাগের প্রতি বৈশ্বিক শ্রদ্ধার্ঘ্য। ভাষার জন্য জীবন দেওয়া এক জাতির ইতিহাস বিশ্বসভায় স্বীকৃতি পায়; একুশে হয়ে ওঠে সারাবিশ্বের ভাষা-সংগ্রামের অনুপ্রেরণা।
এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে একুশে আর কেবল বাংলাদেশের সীমায় আবদ্ধ থাকেনি। আফ্রিকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে লাতিন আমেরিকার আদিবাসী সমাজ, ইউরোপের আঞ্চলিক ভাষাভাষী জনগণ থেকে এশিয়ার ছোট জাতিসত্তা—সবাই তাদের মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার সংগ্রামে একুশের চেতনাকে স্মরণ করে। ভাষাগত বৈচিত্র্য যে মানবসভ্যতার সৌন্দর্য ও সম্পদ—এই বোধ বিশ্বব্যাপী জোরদার হয় একুশের স্বীকৃতির মাধ্যমে।
আজ বিশ্বের নানা দেশে ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার হিসেবে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি ভাষার বিলুপ্তি মানে একটি সংস্কৃতির নিঃশব্দ মৃত্যু। তাই একুশে কেবল স্মৃতির দিন নয়; এটি ভাষাগত বহুত্ব, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও মানবিক অধিকারের বৈশ্বিক আন্দোলনের প্রতীক।
বাঙালির রক্তে লেখা ইতিহাস আজ বিশ্বমঞ্চে উচ্চারিত—এ এক অনন্য গৌরব, এক অমর উত্তরাধিকার।
শোক থেকে শক্তি/
রাত পেরিয়ে যখন ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহর নামে, বাংলার আকাশে এক বিশেষ নীরবতা নেমে আসে। সেই নীরবতার বুক চিরে খালি পায়ে মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে দেশের আনাচে-কানাচে শহীদ মিনারগুলো। সাদা-কালো পোশাকে, বুকে কালো ব্যাজ, হাতে ফুল—শিশু থেকে বৃদ্ধ, ছাত্র থেকে শ্রমিক—সবাই এগিয়ে যায় শহীদদের বেদীর দিকে। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে জাতির আত্মসমীক্ষা।
১৯৫২ সালের সেই রক্তাক্ত দুপুরের স্মৃতি যেন এখনও বাতাসে ভাসে। পুলিশের গুলিতে যখন তরুণদের দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, তখন বাঙালি প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করে—মাতৃভাষা কেবল উচ্চারণ নয়, এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। সেই রক্ত মুছে যায়নি; বরং তা শুকিয়ে হয়ে গেছে অগ্নিশিখা, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সাহসের প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে।
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি”—এই গান শুধু সুর নয়, এটি বাঙালির সম্মিলিত আর্তনাদ, ইতিহাসের সাক্ষ্য। গানের প্রতিটি পংক্তি যেন আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় মেডিকেল কলেজের সামনের সেই উত্তাল মুহূর্তে, যেখানে তরুণেরা বুক পেতে দিয়েছিল ভাষার অধিকারের জন্য। সেই শোক আজও অশ্রু ঝরায়, কিন্তু তা দুর্বলতার অশ্রু নয়—এটি অঙ্গীকারের অশ্রু।
একুশে আমাদের শিখিয়েছে, অন্যায়ের সামনে মাথা নত করা নয়—প্রতিবাদে দাঁড়ানোই সম্মানের পথ। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, বৈষম্য কিংবা নিপীড়ন—যে রূপেই আসুক না কেন, একুশের চেতনা আমাদের সাহস জোগায় তা প্রতিহত করতে।
এই দিনটি তাই শোকের স্মারক হয়েও শক্তির উৎস। শহীদ মিনারের বেদীতে অর্পিত প্রতিটি ফুল যেন একেকটি প্রতিজ্ঞা—ভাষার মর্যাদা রক্ষা করব, মানবিক অধিকার সমুন্নত রাখব, এবং ইতিহাসের সেই রক্তঋণ কখনও ভুলব না।
অমর একুশে আমাদের চোখ ভিজিয়ে দেয়, আবার সেই অশ্রুকেই পরিণত করে অগ্নিস্ফুলিঙ্গে—যেখান থেকে জন্ম নেয় প্রতিবাদ, আত্মমর্যাদা ও জাতিসত্তার অদম্য শক্তি।
আজকের প্রাসঙ্গিকতা/
সময়ের স্রোত বদলেছে, বদলেছে যোগাযোগের মাধ্যম, জ্ঞানের পরিসর, প্রযুক্তির ভাষা। আমরা প্রবেশ করেছি ডিজিটাল যুগে—যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, বিশ্বায়ন ও বহুভাষিক যোগাযোগ আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই দ্রুত পরিবর্তনের ভেতর বাংলা ভাষা কতটা নিরাপদ, কতটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে?
আজকের চ্যালেঞ্জ আর কেবল রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতির নয়; আজকের লড়াই ভাষার সক্ষমতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার। প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় মাতৃভাষার কার্যকর ও সম্মানজনক ব্যবহার নিশ্চিত করা সময়ের অপরিহার্য দাবি। যদি জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ভাষা হিসেবে বাংলা শক্ত অবস্থান নিতে না পারে, তবে একুশের আত্মত্যাগ পূর্ণতা পাবে না।
একুশের চেতনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ভাষা কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি উন্নয়নের ভিত্তি। যে জাতি নিজের ভাষায় চিন্তা করে, গবেষণা করে, সৃজন করে—সেই জাতিই আত্মবিশ্বাসী ও সৃজনশীল হয়ে ওঠে। তাই বাংলা ভাষাকে ডিজিটাল কনটেন্ট, সফটওয়্যার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের পরিসরে সমৃদ্ধ করা আজ একুশেরই ধারাবাহিকতা।
অমর একুশে তাই কেবল অতীতের রক্তস্মৃতি নয়; এটি বর্তমানের দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতের অঙ্গীকার। শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ হয় না কেবল ফুল দিয়ে; শোধ হয় কর্মে, চিন্তায়, নীতিতে। ভাষার মর্যাদা রক্ষা, বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গঠন, গণতান্ত্রিক চেতনা সমুন্নত রাখা—এসবই একুশের প্রকৃত শিক্ষা।
আজ অমর একুশে—বাঙালির আত্মমর্যাদার দিবস। এটি আমাদের শেখায় মাথা নত না করতে, অন্যায়ের সামনে দৃঢ় থাকতে, এবং নিজের ভাষায় নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে। রক্তে লেখা যে ইতিহাস, তার আলোকেই আমরা এগিয়ে যাই—মাথা উঁচু করে, আত্মবিশ্বাসে, অঙ্গীকারে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net